নিরাপদ খাদ্যের সন্ধানে -Prof. Dr. Monir Uddin, Chairman

খাদ্য ও পানিয় আমাদের নিত্যদিনের অপরিহার্য চাহিদা। প্রাত্যহিক জীবনে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য যোগান দেয়ার সামাজিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে রাষ্ট্রের। ক্রমহ্রাসমান আবাদযোগ্য ভূমি ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার এবং প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের মধ্যেও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট সক্ষমতা অর্জন করেছে। খাদ্যপণ্য, সবজি,মিঠা পানির মাছ ইত্যাদি এমন কি পুষ্টিমানের বিবেচনায় প্রয়োজনীয় খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধিত হলেও নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির সূচকে বৈশ্যিক মানদন্ডে তা এখনও অনেক পিছিয়ে। উৎপাদন,আহরণ পরবর্তীতে প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, বিপণন ও পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ন রেখে খাদ্য প্রস্তুতি সহ সকল পর্যায়ে স্বাস্থ্য সম্মত ও দূষণমুক্ত অবস্থাকে এককথায় নিরাপদ খাদ্য বলা হয়। তাই শুধু খাদ্য উৎপাদন কিংবা পরিমিত খাদ্য গ্রহণ নিশ্চিৎ করলেই চলবেনা সর্বক্ষেত্রে নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিৎ না করলে উন্নয়ন সচল থাকবেনা।

নিরাপদ ও পুষ্টিগুন সম্পন্ন খাদ্য নিশ্চিৎ করতে বাংলাদেশে ১৯৫৯ সালের বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ ও ১৯৬৭ সালের বিশুদ্ধ খাদ্য আইনের ১৫(এ) ও ১৮(এ) অধ্যায় বলে সরকারের দায়বদ্ধতা চলে আসছিলো। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের মহান সংসদে খাদ্য নিরাপত্তা আইন ২০১৩ অনুমোদিত হলে তা ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারী হতে কার্যকর হয়। যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তৃণমূলে উৎপাদন থেকে খাবার টেবিলে সরবরাহ পর্যন্ত নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তিতে একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই সংস্থার উৎপাদন, আমদানী, রপ্তানী, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, সরবরাহ ও বিপণন সর্বত্র নিয়ন্ত্রন ও পর্যবেক্ষণের সর্বময় কর্তৃত্ব রয়েছে।

কৃষিজাত ও প্রাণীজাত পণ্য উৎপাদনে সার, সহায়ক ওষুধ, খাদ্যে মিশ্রিত রং বা উপকরণ ও সংরক্ষকের ব্যবহার সর্বজনবিদিত। কিন্তু ক্ষতিকর সংযোজন, এন্টিবায়োটিক ইত্যাদি যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তি মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। অর্গানোফ্লোরিন,অর্গানোফসফেট, অর্গানোকার্বামেট এবং অন্যান্য বালাইনাশক ব্যবহার কমিয়ে উত্তম কৃষি ব্যবস্থাপনা প্রয়োগ করা না গেলে ক্ষতিকর রাসায়নিকের প্রভাবে ঐসবের অবশেষ ভয়ানক স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ায়। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ অন্যান্য তদারকী সংস্থার সাথে সমন্বয় করে আধুনিক ও নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত রয়েছে। আগামী ২৮ এপ্রিল, ২০১৮ তারিখে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে অনুষ্ঠিতব্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন এলামনাই এসোসিয়েশান (BONDING) নিরাপদ খাদ্য ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সেমিনারে এই সম্পর্কিত জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করবেন প্রবন্ধকারবৃন্দ।

নিরাপদ পোল্ট্রিজাত পণ্য উৎপাদনে জীব নিরাপত্তা এবং উত্তম খামার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিৎ করার মাধ্যমে খাবারে এন্টিবায়োটিক এবং বিভিন্ন ফিড এডিটিভ, মুরগী ও ডিমে ড্রাগ রেসিডিউ কমিয়ে খাদ্য পণ্য নিরাপদ করা সম্ভব তা ইতিমধ্যে প্রমাণিত। গরু মোটা তাজা করণে মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর স্টেরয়েড কিংবা এন্ট্রি হিস্টামিন জাতীয় ড্রাগ ব্যবহার প্রতিরোধ করে প্রাণীজ আমিষ নিরাপদ করা যায়। তেমনি গাভীর যথাযথ যত্ন দিয়ে নিরাপদ দুগ্ধ আহরণ করা যেতে পারে। মৎস্য উৎপাদনে উত্তম মৎস্যচাষ ব্যবস্থাপনায় জীবানুমুক্ত পোনার ব্যবহার, নিরাপদ মাছ ও সবজি উৎপাদনে একোয়পনিক গার্ডেনিং প্রযুক্তি এখন সময়ের দাবী। পুকুরে মাছের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে তিকর রাসায়নিক সারের স্থলে ডার্মিকম্পোষ্ট ব্যবহার করা যায়। এছাড়াও মাছ উৎপাদন ও সংর ণে তিকর রাসায়নিক ও ফরমালিন জাতীয় দ্রব্যাদি ব্যবহারের বিষয়ে জনসাধারণের সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবকেন্দ্রিক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান, পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশান (পিকেএসএস) নিরাপদ খাদ্যপণ্য উৎপাদনে তৃণমূলে উত্তম কৃষি ব্যবস্থাপনা অভ্যস্থে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে।

গরু খাদ্য অনিরাপদ ও পুষ্টিগুণ অপর্যাপ্ত হলে মানব স্বাস্থ্য ঝুঁকি মারাত্নক পরিণতি বয়ে আনবে। কিন্তু সার্বিকভাবে দেশের উৎপাদিত ও সরবরাহকৃত খাদ্যপণ্য কতটা নিরাপদ সেটা পরিমাপের যেমন সঠিক পদ্ধতি অপ্রতুল আবার যতটুকু অর্জন তাও সঠিক পর্যবেক্ষণ ও আইনের সীমাবদ্ধতায় অকার্যকর। বৈশ্বিক মানদন্ডে নিরাপদ উপায়ে খাদ্যপণ্য উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রন, মজুদ, সরবরাহ, বিপনন ও গ্রহণ পরিপূর্ণভাবে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। প্রতিনিয়ত এসব বিষয়ে উচ্চতর ধারণা ও প্রয়োগের মাধ্যমে একবিংশ শতাব্দির উপযোগি মানব সম্পদ তৈরীর সোপান হতে পারে নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা। খাদ্যমান অর্জনে ভৌত, জৈব ও রাসায়নিক সকল ধরণের ব্যবস্থাপনা নিশ্চিৎ করতে পারলেই শুধুমাত্র নিরাপদ খাদ্য নিশ্চয়তা সম্ভব। পয়ঃব্যবস্থাপনা, পশুর মাংস সংগ্রহের সনাতনি পশুজবাই আধুনিকিকরণ ও রান্নাঘরে রেফ্রিজারেটরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সঠিকভাবে নজরধারীর মাধ্যমে খাদ্য দুষণ থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব। এছাড়া রাস্তার ধারে গজে উঠা অনিয়ন্ত্রিত খাবারের দোকান, সম্পূর্ণ অনিরাপদ –ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির জন্য অনেকাংশে ক্ষতিকর। আমরা খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করে বিশাল জনগোষ্ঠিকে এমন কি অধুুনা ১০ লক্ষ রোহিঙ্গাদের খাদ্য সরবরাহে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু, আমাদের অজান্তেই বিভিন্ন উপায়ে খাদ্যকেই করা হচ্ছে বিষাক্ত। উৎপাদন প্রকিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ এবং পরিবেশন যথাযথ না হলে তা বিশদমূলক হয়ে উঠে। ঘরে এনে রাখাতেও থাকে গলদ, প্লেটে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করলেও বিষাদমুক্ত হওয়া যায়না।

সামগ্রিক জীবনে আধুনিক প্রযুক্তিতে সংরক্ষণ, রান্না ও খাদ্য গ্রহণে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে কিন্তু তাতে নিরাপদ হচ্ছে কিনা তা প্রশ্নাতীত নয়। একারণে বিশেষ কটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। যেমন, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন উপায়ে প্রস্তুত ও গ্রহণ, কাঁচা রান্না করা খাবার আলাদা রাখা, ভালভাবে অর্থাৎ পরিপূর্ণ সেদ্ধ করা, নিরাপদ তাপমাত্রায় খাদ্য সংরক্ষণ এবং নিরাপদ পানি ও নিরাপদ উপকরণের ব্যবহার। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিৎ করতে খাদ্যের কঠোর মান নিয়ন্ত্রন অতীব গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে মাছ, মাংস, সবজী পরিবহন বিপদজনক ও সংক্রমণের ঝুকি বাড়ায় এ বিষয়ে সচেতনা অর্জন প্রয়োজন। সুপেয় পানির জন্য রিভার্স অসমোসিস কিংবা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ যথেষ্ট কার্যকর পস্থা।

খাদ্যদূষণ ও খাদ্যে ভেজাল এক নয়। খাদ্যে ভেজাল মেশানো অনৈতিক এবং তা অবশ্যই কঠোর আইনি প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রন করতে হবে। কিন্তু খাদ্য দূষণ একটি জটিল প্রক্রিয়া এবং উৎপাদকের ও ভোক্তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও উৎপাদিত খাদ্য দূষিত হতে পারে। আবার নিরাপদ উপায়ে উৎপাদিত খাদ্যও অনিরাপদ হ্যান্ডেলিং এর কারণে দূষিত হয়ে যায়। খাদ্য উৎপাদনে মাটি পানি ও বাতাসের দূষণ থাকলেও উৎপাদিত খাদ্য দূষিত হয়ে যায়। এ বিষয়ে পর্যাপ্ত সচেতনতা নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তিতে গুনগত পরিবর্তন আনতে পারে। দেশের সিংহভাগ খাদ্য আসে কৃষি থেকে। কিন্তু উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে সার, কীটনাশক যথাযত ব্যবহার না করলে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরী করে। আমিষজাত খাদ্যের প্রধান উৎস পোল্ট্রি ও মাছ বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে। পোল্ট্রি ও মাছে ভয়াবহমাত্রায় ক্রোমিয়াম ও সামা পাওয়া যায়। সম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায় মানবদেহে যেখানে ক্রোমিয়ামের সহনীয় মাত্র প্রতিদিন মাত্র ২৫ পিপিএম এর বেশী হলে অতিরিক্তটুকু শরীরে জমা হতে থাকে এবং একপর্যায়ে প্রাণঘাতি রোগ সৃষ্টি হবে। অথচ মাত্র এক মাস বাজারে প্রচলিত পোল্ট্রি ফিড খাওয়া মুরগীর মগজে পাওয়া যায় ৭৯৯ পিপিএম এবং ২ মাসে খাবার খাওয়া মুরগী তা হয় ৩৫৬১ পিপিএম (প্রতি কেজিতে) মাংস,হাড়, রক্ত, চামড়া প্রভৃতিতেও তার পরিমান ভয়ানকভাবে বেশী। এ অতিরিক্ত ভারী ধাতুর উপস্থিতি সর্বসাধারণের জন্য ভয়ানক উদ্বেগের বিষয়। এইৃ–খূ উন্নতমানের নিরাপদ খাদ্য পরীক্ষাগার স্থাপন করেছে। ইতিমধ্যে বিএসটিআই, পরিবেশ অধিদপ্তরও মানসম্পন্ন ফুড ল্যাব তৈরী করেছে। এতসব আয়োজন, রাষ্ট্রীয়, বিভিন্ন সেবা সংস্থা ও ব্যাক্তগত উদ্যোগ কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর হচ্ছেনা সচেতনতার অভাবে।

রসায়ন এলামনাই এসোসিয়েশান, বন্ডিং সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সর্বস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিকভাবে যে সব উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছে আসন্ন সেমিনার তারই প্রতিফলন। এ সেমিনারে FAO, পিকেএসএফ, বিএসটিআই, গবেষক–বিজ্ঞানী, পরিবেশ অধিদপ্তর,ক্যাব, খাদ্য পণ্যের উৎপাদন ও বিপণনে সংশ্লিষ্ট নাগরিক সমাজ এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে এক কাফেলায় এনে যৌক্তিক সচেতনতার ম্যাসেজ প্রদানের প্রয়াস নিয়েছে। আসুন আমরা সবাই অংশগ্রহণ ও পারস্পরিক মেলবন্ধনে নিজে এবং প্রজন্মকে সুস্থ জীবনের নিশ্চয়তা বিধানে নিরাপদ খাদ্যের সন্ধানে আত্মনিয়োগ করি।

লেখকচেয়ারম্যানরসায়ন বিভাগচট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Post comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • News & Events

    • সুবর্ণ জয়ন্তী নিবন্ধন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন

      January 13, 2019

      সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা এই বাংলাদেশের দক্ষিন পূর্বাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, যার প্রতিষ্ঠা আজ থেকে পঞ্চাশ বছরের অধিক পূর্বে। প্রতিষ্ঠাকালীন বছরগুলোতে যেকটি বিভাগ...   Read More

    • নিরাপদ খাদ্যের সন্ধানে -Prof. Dr. Monir Uddin, Chairman

      April 27, 2018
      29793197_10211978605920475_7787434054720654355_n

      খাদ্য ও পানিয় আমাদের নিত্যদিনের অপরিহার্য চাহিদা। প্রাত্যহিক জীবনে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য যোগান দেয়ার সামাজিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে রাষ্ট্রের। ক্রমহ্রাসমান আবাদযোগ্য ভূমি ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার...   Read More

    • Press Conference on the occasion of Food Safety Seminar 2018

      April 27, 2018

      আগামী ২৮ এপ্রিল ২০১৮, শনিবার, রসায়ন এলামনাই এসোসিয়েশান BONDING এর উদ্যোগে Food Safety & Public Health বিষয়ে সেমিনার। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদস্থ World Trade Center এর...   Read More

    • Seminar on Food Safety and Public Health

      April 13, 2018
      Paper news1

      চট্টগ্রামে Food Safety and Public Health সেমিনার। ২৮ এপ্রিল ২০১৮ World Trade Center এর চেম্বার অডিটরিয়ামে খাদ্য সচেতনতায় আয়োজন সবার অংশগ্রহন প্রয়োজন। সম্মিলিত প্রচেষ্টায়...   Read More

© 2015 Chittagong University. All rights reserved.